আমাদের সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ
এমন একটি অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, আমাদের সাহিত্য ও শিল্পকলার আলোচনায় যে, স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরেও মুক্তিযুদ্ধের যথাযথ রূপায়ণ অথবা প্রতিফলন হয়নি শিল্প-সাহিত্যে। পৃথিবীর বিখ্যাত বিপ্লবগুলো অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে মহৎ সৃষ্টির পিছনে—ফরাসি বিপ্লব অথবা রুশ বিপ্লবের রয়েছে এক বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার। পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়নি কিন্তু একটি সীমিত ভূগোলে ভয়ানক তোলপাড় তুলেছে তেমন জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনাবলিও জন্ম দিয়েছে ধ্রুপদ সাহিত্যের, প্রাণস্পর্শ শিল্পের। আফ্রিকার দেশগুলোর স্বাধীনতাপ্রাপ্তি, লাতিন আমেরিকার বামপন্থি বিপ্লব অথবা ষাটের দশকে ইউরোপে দ্রুত ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক- আদর্শিক পটপরিবর্তনের উদাহরণ আমাদের জীবনকাল থেকে সংগৃহীত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে যদি সেই নিরিখে বিচার করি আমরা, তাহলে এর বিশালতাকে ওই ঘটনার বহিঃস্থ একজন প্রত্যক্ষদর্শীও স্বীকার করে নেবেন। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী শিল্প-সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ কেন উপস্থিত নয়, যতটা থাকা উচিত ছিল, অন্তত অনেক পাঠক সমালোচক যা মনে করেন, সেই প্রশ্নটি অবধারিতভাবেই উচ্চারিত হয় এবং আমাদের একটি শূন্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু করে তোলে।
এ অভিযোগের দুটি দিক আছে। প্রথমত, অভিযোগকারীর সিদ্ধান্ত হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যথেষ্ট লেখালেখি হচ্ছে না, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ও রূপায়ণ হচ্ছে না আমাদের শিল্প-সাহিত্যে। এ বিচারটিতে যে বিষয়টি প্রাধান্য পায়, তা একটি পরিমাণগত ধারণা: ‘যথেষ্ট’ বলতে কতটা বা কী পরিমাণ, এটি নির্ধারণের দায়িত্ব এসে পড়ে অভিযোগকারীর ওপর। যারা এ মত পোষণ করেন যে, মুক্তিযুদ্ধ মোটেও অবহেলিত হয়নি সাহিত্যে ও শিল্পে, তারা এ পরিমাণগত ধারণাটিকে গ্রহণ করতে রাজি হন না। তারা বরং বলেন যে, আমাদের নাটক যেমন মুক্তিযুদ্ধের ফসল, তার প্রত্যক্ষ অবদান এবং শিল্প-সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমেও মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব সুনির্দিষ্ট, ভাস্কর্যের কথা তারা উল্লেখ করেন, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত একটি শিল্প-মাধ্যম হিসেবে সংহতি অর্জন করেছে স্বাধীন বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে প্রচুর বইপত্র, প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ ইত্যাদি লেখা হয়েছে, সেসবও, তাদের মতে, পরিমাণগত ধারণাটিকে দুর্বল প্রমাণিত করে। তবে অভিযোগের দ্বিতীয় যে দিকটি নিয়ে আমাদের ভাবতে হয়, তা হচ্ছে, আমাদের শিল্প-সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের উপস্থিতির গুণগত বিচারটি। মুক্তিযুদ্ধকে কীভাবে দেখা হচ্ছে, কোন দৃষ্টিকোণ থেকে; মুক্তিযুদ্ধের কোন বিষয়টি কোন পদ্ধতিতে একজন কবি, ঔপন্যাসিক অথবা চিত্রকর তার কাজে প্রকাশ করেছেন—এ বিবেচনাটি যদি প্রধান হয়, তাহলে পরিমাণ-চিন্তাটি গৌণ হয়ে যায়। আমাদের দেশে এ দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা হয়েছে কম এবং হলেও পদ্ধতিগত কোনো শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে প্রসঙ্গগুলোর অবতারণা হয়নি। এজন্য এখনও সাহিত্য ও শিল্পবিচার, বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত একটি নির্দিষ্ট বৃত্তেই আবর্তিত হচ্ছে।
পদ্ধতিগত যে শৃঙ্খলার কথা বলা হলো, এটি তৈরি হয় তাত্ত্বিক একটি ভূমি থেকে। ‘তাত্ত্বিক’ কথাটি কিছুটা ভীতিপ্রদ এবং সন্দেহজনক আমাদের সময়ে : কিন্তু তত্ত্বকে বিনির্মাণ করলে কিছু শনাক্তযোগ্য চিন্তার সমাবেশ চোখে পড়ে, যেগুলো ব্যাখ্যা অথবা ভাবনার জন্য একটি সম্ভাবনাময় জগৎ সৃষ্টি করে। যেকোনো তত্ত্বেও কিছু অভিন্ন উপাদান থাকে, যারা একাধিক চিন্তাকে একটি সংহত রূপদান করে; কিন্তু তাই বলে ওই চিন্তাগুলো যে সহজে নিষ্পত্তিযোগ্য অথবা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে, তা নয়। একটি চিন্তা ক্রমশ পরিব্যাপ্ত হতে হতে অতি সূক্ষ্ম, বিমূর্ত রূপ ধারণ করে; কিন্তু তত্ত্ব এ বিমূর্তায়নের অতীত একটি সংহতির সম্ভাবনাকে মূর্ত করে। মুক্তিযুদ্ধ শিল্প-সাহিত্যে কীভাবে প্রতিফলিত হয়, হতে পারে, হওয়া উচিত—এবং না হলে, সকল ক্ষেত্রে কেন নয়, এর একটি তাত্ত্বিক অনুসন্ধান আমরা করতে পারতাম। এখনও করতে পারি, কারণ যেকোনো ইতিহাসের মতো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটিও সময়ের সঙ্গে আরও সমৃদ্ধ হয়, এ ইতিহাস সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টি আরও বেশি অনুসন্ধিৎসু হয়। তাছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের পর প্রায় চল্লিশ বছর পার হওয়ার মধ্যে একটি নৈর্ব্যক্তিক দূরত্বও রচিত হয়েছে ওই ঘটনা এবং এ সময়ের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে, যা ইতিহাস বিচারের জন্য প্রয়োজনীয়।
যদি তেমন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).


Comments